গণঅভ্যুত্থানে লাখাই উপজেলার শহীদ ও আহত দুই সহোদরের পরিবারের কান্না দেখার কেউ নেই।
প্রতিনিধিঃ
রফিকুল ইসলাম, লাখাই(হবিগঞ্জ)
জুলাই-আগস্টের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে লাখাই উপজেলা একই পরিবারের আপন দুই ভাইয়ের মধ্যে ছাট ভাই মোনায়েল আহমেদ ইমরান (১৬) শহীদ হয়েছেন। আর বড় ভাই তোফায়েল (২১) আহত হয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। অভ্যুত্থানের পাঁচমাস অতিবাহিত হলেও শহীদ ও আহত পরিবারে এখনও স্বস্তি ফেরেনি। স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর ঐ শহীদ ও আহত পরিবার।
গুলিবিদ্ধ তোফায়েল ও শহীদ মোনায়েল আহমেদ ইমরানের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার কামালপুরে। বাবার নাম ছোয়াব মিয়া। না’গঞ্জ পার্ক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি বিষয়ে ৮ম সেমিষ্টারের শিক্ষার্থী তোফায়েল।
সানারপাড়ের দক্ষিন সাহেবপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকত। পিতা ছোয়াব মিয়া ঢাকা বেগম বাজারে পুরাতন কাপড়ের ব্যবসা করে টানাপড়েনের সংসার এবং ছেলে মেয়ের লেখা পড়ার খরচ চালাতেন। ছেলেদের শোকে এখন আর ঢাকাও যান না,বাড়িতেই থাকেন। জুলাইয়ের ১৮ এবং ২১ তারিখ মাত্র ২ দিনের ব্যবধানে এ হৃদয় বিদারক ঘটনা দু’টি ঘটে একটি পরিবারে। শুরু থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এ মেধাবী শিক্ষার্থী তোফায়েল।
গত ১৮ জুলাই আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনও তিনি ছিলেন সামনের কাতারে। ওই দিন বিকেল ৩টা। সাইনবোর্ড মহাসড়ক তখন ছাত্র জনতার দখলে। রাস্তা অবরোধ করে রেখেছিলো আন্দোলনকারীরা। এমন সময় মহাসড়কে পার্কিং করা কয়েকটি ট্রাকের আড়াল থেকে পুলিশ গুলি করে।
এতে একে একে করে শরীরে মোট ৭৯টি গুলি বিদ্ধ হয় তোফায়েলের শরীরে। প্রথমে তাকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় প্রো-এ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তার শরীর থেকে ওইদিন মোট ৫৭টি গুলি বের করা হয়। এরপর ডিসেম্ভব মাসের ৩ তারিখে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।
ওই দিনই তার বাম হাতের শোল্ডার থেকে আরো একটি গুলি বের করা হয় অপারেশনের মাধ্যমে। শোল্ডারে পচন ধরায় কিছু অংশ কেটে ফেলতে হয়। চার দিনের চিকিৎসা শেষে তিনি বাসায় ফেরেন। কিন্তু এখনো তার শরীরে রয়েছে গেছে ২১টি গুলি। যেগুলো আর বের করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তার দুই হাতের আঙ্গুল ও তালুতে রয়েছে অসংখ্য গুলি। যে কারনে হাত মুষ্টিবদ্ধ করতে পারেননা। ঘুমাতে পারেন না বাম কাত হয়ে।
অর্থসংকটের কারণে থেমে আছে গুলিবিদ্ধ তোফায়েলের চিকিৎসা। এদিকে ঢাকায় বেড়াতে আসা লাখাইয়ের জিরন্ডা মানপুর তোফায়েলিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ৮ম শেনীর ছাত্র ইমরান বড় ভাই তোফায়েলের গুলিবিদ্ধ ঝাঁজরা শরীর দেখে নিজেকে স্থীর রাখতে পারেননি। বড় ভাই তোফায়েলকে বাসায় রেখেই ১৯ তারিখ থেকে ইমরান আন্দোলনে যোগ দেয়। রাত না হলে বাসায় ফিরতো না। রাস্তায় হালকা খাবার খেতো।
পরদিন ২০ জুলাই ভোর হতেই ইমরান ছুটে যায় মহাসড়কে। অন্যদের সঙ্গে সাধ্যমতো মিছিলে শ্লোগান দেয়। ঢাকার রাস্তা-ঘাট অচেনা বিবেচনায় বিকেলে বাসায় ফিরলে বাবা-মা তাকে রুমে আটকে রাখে। ২১ তারিখ সকালেও ইমরানকে রুমের ভেতর রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাইরে যাবার জন্য ঝটফট করছিলো ইমরান।
অনেক কাকুতি-মিনতি করে তালা খুলে দেয়ার জন্য। কিন্তু কেউ তালা না খোলায় শেষে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে এ কিশোর। বাইরে গিয়ে এক কাপ চা ও চিপস খেয়ে ফিরে আসবে বলে ওইদিন বেলা দেড়টার দিকে বাসা থেকে বের হয়। সে যাওয়াই তার শেষ যাওয়া।
সানারপাড় মোড়ে বেলা পৌনে ৩টার দিকে পুলিশের হেলমেট পরা সিভিল ড্রেসে থাকা ব্যক্তির চাইনিজ রাইফেলের গুলি তার পেছন থেকে ভেদ করে বুকের সামনে দিয়ে বের হয়। তাকে দ্রুত নেয়া হয় প্রো এ্যাকটিভ মেডিকেল। চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার জন্য রেফার করেন।
কিন্তু সেখানে আসার পথে রায়েরবাগে পুলিশ তাকে বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স আটকে দেয়। এ্যাম্বুলেন্সে তার সাথে থাকা সহ আন্দোলনকারীদের মারধর করার পাশপাশি মোবাইল ফোনও কেড়ে নেয় পুলিশ। প্রায় আধাঘন্টা আটকে রাখায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরন হলে ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষনা করেন।
কিন্তু পরিবারের সদস্যরা বিষয়টা জানতে পারেন রাত ১২টার দিকে। ঢামেক মর্গে গিয়ে ছেলের লাশ সনাক্ত করেন ইমরানের বাবা ছোয়াব মিয়া। তোফায়েল ও ইমরানের ২ বোন জিনিয়া নাসরিন ও জেরিন নাসরিন। জিনিয়া নাসরিন পার্ক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার টেকনোলজি বিষয় এ অষ্টম পর্বের ছাত্রী।
জেরিন নাসরিন লাখাই মুক্তিযুদ্ধা ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। শহীদ ইমরানের বাবা বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমাদের আশা ভরসা কিছু নেই। আমার আশা ছিল ছেলে দুইটিকে ঘিরে। এখন আমরা মেয়েগুলো নিয়ে কি করবো জানি না। মেয়ে দুইটি পড়াশোনা করছে তাদের পড়াশোনা ও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সরকার যদি আমার আহত ছেলেটাকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতো,তাহলে খেয়ে পরে বাঁচতে পারতাম। তিনি আরো বলেন,ছেলের চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা চলে গেছে। ধারদেনা করে চিকিৎসা করেছি। ছেলের চিকিৎসাতো দুরের কথা এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসা পেলে আমার ছেলে তোফায়েল আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসত। কিন্তু আমাদের কান্না দেখার কেউ নেই?
আরও পড়ুন
- বোরহানউদ্দিনে ইসলামী আন্দোলনের গণ সমাবেশ
- ভোলায় বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যসহ ৫ কারবারি আটক
- বোরহানউদ্দিনে খাবারে নেশা খাওয়াইয়া অচেতন করে ২ লক্ষ টাকা চুরি অসুস্থ্য ৫ জন
শেয়ার:
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Reddit (Opens in new window) Reddit
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Pocket (Opens in new window) Pocket
- Share on Threads (Opens in new window) Threads
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
Discover more from সমবানী
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
