তিন মাস বন বন্ধ, পেটে আগুন: বাঁচার লড়াইয়ে সুন্দরবনের মানুষ
প্রতিনিধিঃ
কাজী ওমর ফারুক, মোংলা
বনের খালে নৌকা নেই, গাছে মৌচাক খুঁজতে কেউ ওঠে না, মাটির পথ ধরে হাঁটে না আর পাথরের পায়ের ছাপ। সুন্দরবনের বুক আজ নিঃস্তব্ধ। বনের জীববৈচিত্র্য যখন নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছে, তখন বাইরে বসে ক্ষুধার্ত মানুষেরা একরাশ হতাশা নিয়ে প্রতিদিন ফিরে যাচ্ছে খালি হাতে।
১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট—তিন মাসের জন্য সুন্দরবনের সব নদ-নদী, খাল-বিল, গাছ-গাছালি নিষিদ্ধ করা হয়েছে মানুষের জন্য। মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ, এমনকি পর্যটনও পুরোপুরি বন্ধ। উদ্দেশ্য মহৎ—প্রকৃতিকে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু বনের উপর যাদের সংসার চলে, তারা আজ একপ্রকার বন্ধ ঘরের মানুষ।
মোংলার জেলে ইব্রাহীম শিকদার কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
“বনের মাছেই আমার সংসার চলে। এখন তিন মাস কোনো আয় নেই। মেয়েটা সারা রাত কাশে, ওষুধ কেনার টাকাও নেই। সরকার যদি একটা মুঠো চালও না দেয়, তবে কোথায় যাব?”
রুস্তম বয়াতী, যিনি সারা জীবন সুন্দরবনের খালে জাল ফেলেই বেঁচে আছেন, বললেন,
“আমরা অপরাধ করতে চাই না, কিন্তু যখন ছোট ছেলেটা ক্ষুধায় কাঁদে, তখন আইন মনে থাকে না। ভাতের জন্য যদি বনে ঢুকতে হয়, ঢুকবো। আর কি করার আছে?
এই মৌসুমকে মাছ, হরিণ ও বাঘের প্রজননকাল হিসেবে চিহ্নিত করেছে বন বিভাগ। তাই তারা বন রক্ষায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, বন্ধ করে দিয়েছে পারমিটও।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান,
“এই সিদ্ধান্ত শুধু বনের প্রাণীদের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদে এই বন টিকিয়ে রাখার জন্য জরুরি।”
তবে, বাস্তবতা বলছে—এই ‘জরুরি’ সিদ্ধান্ত অনেক পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছে চরম সংকটে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রায় দুই হাজার পরিবার এখন দিশেহারা। ট্যুর অপারেটর এমাদুল হক বললেন,
“সুন্দরবন বন্ধ, ট্যুর নেই। বাচ্চার স্কুল ফি দিতে পারছি না। বাকি দোকানে। শুধু চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করছি—কবে সময় বদলাবে।
মোংলা উপজেলা জেলে সমিতির সভাপতি বিদ্যুৎ মন্ডল বললেন,
“নিষেধাজ্ঞা যদি বাস্তবায়ন করতেই হয়, তাহলে সরকারকে আগে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। না হলে মানুষ পেটের দায়ে চুরি করবে, অন্য কোনো পেশায় যাবে, বন বাঁচবে না, মানুষও মরবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ হাজার নিবন্ধিত সুন্দরবনগামী জেলে রয়েছেন, আর অনিবন্ধিতদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। বন মন্ত্রণালয়ে তাদের তালিকা পাঠানো হয়েছে, তবে এখনো কার্যকর সহায়তা মেলেনি।
একদিকে বন বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে পেট বাঁচানোর আকুতি। এ যেন এক অসম যুদ্ধ—যেখানে প্রকৃতি হয়তো নিঃশ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু মানুষ দম বন্ধ করে বেঁচে আছে।
শেয়ার:
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Reddit (Opens in new window) Reddit
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Pocket (Opens in new window) Pocket
- Share on Threads (Opens in new window) Threads
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
Discover more from সমবানী
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
