প্রধান শিক্ষককে আওয়ামীলীগ নেতার হুমকি, অতঃপর হত্যা মামলায় গ্রেফতার
প্রতিনিধিঃ
আল আমিন আহমেদ, ভান্ডারিয়া (পিরোজপুর)
ঢাকায় যত নোংরা কেস আছে সবগুলায় তোমারে ঢুকাবো! তোমার ওয়ারেন্ট যাবে, জামিন নিবা, সাসপেন্ড হবা,
প্রধান শিক্ষককে আওয়ামীলীগ নেতার হুমকি, অতঃপর হত্যা মামলায় গ্রেফতার
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে হাফেজ মোঃ ওমর ফারুক নামে এক প্রধান শিক্ষককে চাকুরি ছেড়ে না দিলে মামলায় জাড়ানোর হুমকি দিয়েছে পিরোজপুর জেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এ্যাডভোকেট আখতার হোসেন মাসুদ। এর ধারাবাহিকতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার মিরপুরে নিহত আশরাফুল ইসলাম হত্যা মামলায় চিংগুড়িয়া এন.আই.এইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুককে গত ১২ ডিম্বের গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গ্রেফতার প্রধান শিক্ষককের পরিবারের দাবি তাকে হয়রানিমূলক আসামি করা হয়েছে। ঘটনার দিন ৪ আগস্ট ওমর ফারুক নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রত্যয়নপত্র রয়েছে।
গ্রেফতার হওয়ার পর মুঠোফোনে হুমকির অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের কথোপকথনের অডিওতে আওয়ামীলীগ নেতা প্রধান শিক্ষককে যা বলেছেন—“তোমারে যে তিন মাস সময় দেওয়া হইছে, তুমি যদি তিন মাসের ভিতরে ব্যবস্থা কর তাহলে তুমি ভদ্রভাবে চুপচাপ চলে যাবা। কেউ জানবে না। তিন মাস পরে যত রকমের নোংরা কেস আছে ঢাকা শহরে সব কেসে তোমার নামে কিন্তু প্রতি সপ্তাহে ওয়ারেন্ট যাবে। আমি ম্যানেজিং কমিটির — (গোয়াও) মারিনা। আমার ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশনেরও দরকার নাই। তোমার ওয়ারেন্ট যাবে, জামিন নিবা, সাসপেন্ড হবা। ওয়ারেন্ট যাবে, জামিন নিবা, সাসপেন্ড হবা। চলতেই থাকবে প্রতি সপ্তাহে। যতগুলা নোংরা নোংরা কেস আছে ঢাকা শহরে সবগুলায় তোমারে ঢুকাবো। আমার বিরুদ্ধে কথা বলা আমার বিরুদ্ধে দল করা। আমার প্রোডাকশন আমার বিরুদ্ধে কথা বলবে সেই প্রোডাকশন আমি রাখবো কেন। তোমার তিন মাস সময় আছে, একুশে মে পর্যন্ত। বাইশে মে এর মধ্যে যদি তুমি গুছাইতে পারো, বাইশে মে এর পরে দেখবা আনে তোমার কি কি হয়। খলিল মীর (সাবেক সভাপতি) তো মরেগেছে ইসের চোটে, তুমি যাবা জেল খাটতে খাটতে। জামাত শিবির কত কিছু বানাইতে পারবো আমি, দেখবা আনে কি কি পারে একটা উকিলে। সব সন্ধ্যার মধ্যে লিখিত জমা দাও চুপচাপ তিন মাসের ভেতরে চলে যাও। আর কোন কথা নাই।”
পারিবারি সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ত্রিশ জুন ওমর ফারুক চিংগুড়িয়া এন.আই.এইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। তখন থেকেই বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন পিরোজপুর জেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এ্যাডভোকেট আখতার হোসেন মাসুদ। চাকুরীর প্রথমে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও দিন যত গড়ায় সভাপতির অনৈতিক চাহিদা এবং স্বৈরাচার আচারণ বৃদ্ধি পায়। প্রধান শিক্ষক সভাপতির অনৈতিক চাহিদা এবং স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে গেলে তিনি রোষানলে পড়েন। সাবেক খাদ্য মন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামরে সাথে এ্যাডভোকেট আখতার হোসেন মাসুদের দহরম মহরম সম্পর্ক থাকায় তার নাম ভাঙ্গিয়ে নানা আপকর্ম শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সাল থেকে বিদ্যালয় থেকে চাকুরি ছেড়ে চলে যাওয়ার চাপ দিতে থাকেন সভাপতি। এর পর থেকে এ্যাডভোকেট আখতার হোসেন মাসুদকে বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি না করায় নানা কুটকৌশাল শুরু করে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। কুটকৌশলের অংশ হিসাবে পিরোজপুর কোর্টে দুটি মামলা করেন। একটি মামলা থেকে প্রধান শিক্ষক আব্যহতি পায়। আন্য মামলাটি চলমান রয়েছে। এ্যাডভোকেট আখতার হোসেন মাসুদ ঢাকা মিরপুরে বসবাস করার সুবাধে মিরপুরে নিহত আশরাফুল ইসলাম হত্যা মামলায় প্রধান শিক্ষক ওমর ফারুকে সে মামলায় জড়িয়ে দেয়। এই মামলায় গত ১২ ডিম্বের তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এবিষয়ে চিংগুড়িয়া এন আই এইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারীক আব্দুর রহমান খান জানান, ঘটনার দিন ৪ আগস্ট প্রধান শিক্ষক ওমর ফারুক বিদ্যালয়ে উপস্থি ছিলেন। তাকে ষড়যন্ত্র করে মামলায় আসমী করা হয়েছে।
এবিষয়ে চিংগুড়িয়া এন আই এইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ জাকির হোসেন মোল্লাহ জানান, ৪ আগস্ট যে ঘটনায় আমাদের প্রধান শিক্ষককে হত্যা মামলা দেয়া হয়েছে সেই দিন আমরা সকাল ১০ টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ছিলাম। সে ও আমাদের সাথে ছিল।
গ্রেফতার প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী ফাতিমা খানম বলেন, ‘আমার স্বামী ওমর ফারুক একজন নিরীহ মানুষ। তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ভান্ডারিয়ায় ছিলেন। ঢাকায় যাননি। এছাড়া তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি এবং পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ এর তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আক্তার হোসেন মাসুম এর সঙ্গে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এর জেরে অ্যাডভোকেট মাসুদ বিদ্যায়লয়ের সভাপতি না হতে পেরে ষড়যন্ত্র করে আমার স্বামী ওমর ফারুককে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে এ মামলায় আসামি বানিয়েছেন। শুধু তাই নয় আমার স্বামীকে হয়রানির জন্য আরও দুইটি মিথ্যা মামলায় আসামি করেছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু তদন্ত করে ন্যায় বিচারের জন্য আবেদন জানাচ্ছি।’
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পিরোজপুর জেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এ্যাডভোকেট আখতার হোসেন মাসুদ পলাতক থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে ভান্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহমদ আনওয়ার বলেন, ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত আশরাফুল ইসলাম হত্যার দায়ে মিরপুর থানায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় শিক্ষক ওমর ফারুককে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভান্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী আফিসার ও বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি মোঃ ইয়াছিন আরাফাত রানা জানান, আমার জানা মতে সে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নয়। সে একজন কুরআনের হাফেজ। বিদ্যালয়ের ম্যনেজিং কমিটির সাবেক সভাপতির সাথে তার দ্বন্ধ থাকায় এ ঘটনা ঘটতে পারে।
পিরোজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মঠবাড়িয়া-ভান্ডারিয়া সার্কেল) মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক মিরপুর মডেল থানার আশরাফুল ইসলাম হত্যা মামলার ৪০ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি।
আরও পড়ুন
- বোরহানউদ্দিনে ইসলামী আন্দোলনের গণ সমাবেশ
- ভোলায় বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যসহ ৫ কারবারি আটক
- বোরহানউদ্দিনে খাবারে নেশা খাওয়াইয়া অচেতন করে ২ লক্ষ টাকা চুরি অসুস্থ্য ৫ জন
শেয়ার:
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Reddit (Opens in new window) Reddit
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Pocket (Opens in new window) Pocket
- Share on Threads (Opens in new window) Threads
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
