
বেশ কিছুদিন ধরেই সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা ও বালু-পাথর লুটপাঠ চলে। এতে যাদুকাটা নদীর ইজারাদার অভিযোগ করছেন তাদের প্রতিপক্ষ গভীর রাতে মব সৃষ্টি করে নদীর পাড় কেটে বালু-পাথর লুটপাঠ করছে।
আবার লাউড়ের গড় এলাকাবাসীর অভিযোগ ইজারাদার প্রশাসনের পরোক্ষ মদদে তাদের লোক দিয়ে বালু-পাথর লুটপাঠ করছে আবার রয়েলটি আদায় করছে। এতে যাদুকাটা নদীর তীর এলাকার অন্তত ২০ টি গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে গত কদিন যাবত পক্ষে বিপক্ষে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন সহ নানা কর্মসূচী হয়েছে।
এছাড়াও তিনটি মামলায় ১১৫ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করা হয়। যাদুকাটা নদীতে পাড় কাটার অভিযোগে তাহিরপুর থানায় বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে মামলা হয়েছে ১৬ অক্টোবর । এই মামলায় ৫১ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৩০ জনের নাম অজ্ঞাতনামা হিসেবে রাখা হয়েছে। আবার পরিবেশ অধিদপ্তর আরেক মামলায় অভিযুক্ত করেছে ৩৭ জনকে,তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরেক মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ৩১ জন কে ।
এসব মামলা দায়েরের পর ওখানকার অনেকেই দাবি করেছেন, এজাহারে উল্লেখ করা আসামীদের মধ্যে পাড় কাটার প্রতিবাদকারী অনেকের নাম যুক্ত করা হয়েছে। আবার পাড় কাটার কিছু মূল হোতাদের আসামী করা হয় নি। তাদের অভিযোগ অনেকে জড়িত না থাকলেও পুরনো কোন বিরোধের কারণে অনেকের নাম যুক্ত করা হয়েছে।
লাউড়েরগড় গ্রামের ডাঃ জাহাঙ্গীর ও তার তিন সহোদর মুহিনুর, নুরুল আলম ও সাহাঙ্গীরকে আসামী করা হয় নি। অথচ এরা ২২ নল জায়গা বিক্রয় করেছেন বলে এলাকার একজন তরুণ সাংবাদিক জানিয়েছেন।
জাহাঙ্গীর আলমের দাবী, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। আমি এবং আমার ভাইয়েরা ওই সময় নদীতে যাই নি। তিনি নিজেকে পল্লী চিকিৎসক দাবি করে বললেন, ‘আমি আমার পেশা নিয়েই ব্যস্ত থাকি।’
পাড় কাটা ঠেকাতে সামাজিক আন্দোলনের সংগঠক পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজার ছোট ভাই আস্তারুলের নাম যুক্ত হয়েছে আসামীর তালিকায়। তার বাড়ি অন্য এলাকায়, তাকে কেউ পাড় কাটার ঘটনার আশপাশেও দেখে নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে। এছাড়া নারজেল, পারভেজ ও মাসুদ রানা নামের তিনজনকে আসামী করা হয়েছে।
এরা পাড় কাটার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত ছিল বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। মাসুদ রানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগে থেকেই পাড় কাটা ও ইজারা বহির্ভূত জায়গা থেকে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধের জন্য বিভিন্ন পোষ্ট দিয়েছিলেন। এলাকার ব্যবসায়ী বিল্লাল মিয়া, আব্দুল মোতালিব, আব্দুল মান্নান সহ আরও অনেক কে বিনা কারণেই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এলোপাতারী মামলায় আসামী করায় এলাকাবাসীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে শুক্রবার বিকালে যাদুকাটা নদীর তীরে অন্তত পাঁচ শতাধিক গ্রামবাসীর উদোগে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের ও পাড় কাটা বন্ধের দাবী জানানো হয় ।
দৈনিক ইত্তেফাকের তাহিরপুর প্রতিনিধি আলম সব্বির বললেন, মামলায় অনেক পাড় কাটার হোতা বাদ পড়েছে। আন্দোলনকারী অনেকে আসামী হয়েছে, এ কারণে প্রক্রিয়াটি বিতর্কিত হয়েছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বললেন, যাদুকাটার পাড় কাটার বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই প্রতিবাদ করে আসছি। এলাকার কিছু তরুণ আমাদের সহায়তাও করে। অথচ পাড় কাটার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আমার ভাইকে আসামী করা হয়েছে। আরও কিছু মানুষকে আসামী করা হয়েছে, যারা প্রতিবাদী মানুষ।
যাদুকাটার ইজারাদার নাছির মিয়া বললেন, স্থানীয় সাংবাদিক ও গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া তথ্যসহ স্থানীয় নির্ভরযোগ্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার আসামীর তালিকা করা হয়েছে। আন্দোলনকারী বা প্রতিবাদকারী কাউকে টার্গেট করে মামলা দায়ের করা হয় নি।
তাহিরপুর থানার ওসি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বললেন, তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেবার সময় দোষী যারা আছে, নাম না থাকলেও যুক্ত হবে। নির্দোষ মানুষ হয়রানির শিকার হবে না।
প্রসঙ্গত, গেল মঙ্গলবার রাত ১২ টার পর হঠাৎ করেই দুই থেকে আড়াই হাজার বাল্কহেড প্রবেশ করে যাদুকাটায়। একেকটি বাল্কহেড ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক ছিল। এরা তাহিরপুর সীমান্তের সবচেয়ে বড় বিজিবি ক্যাম্পের (লাউড়েরগড়) কাছাকাছি স্থান থেকে নদীরপাড়ের সাহিদাবাদ পর্যন্ত পাড় কাটা শুরু করে। একইভাবে বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র এবং শনিবারও পাড় কেটেছে তারা।
ঘটনার আকস্মিতকতায় হতভম্ব হয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিও। বিজিবি’র পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে পরদিন জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। ওই চারদিনে কমপক্ষে ১০০ ফুট প্রস্ত করে আড়াই কিলোমিটার অংশ থেকে পাড় কেটে বালু লুট করা হয়, এই পাড়ের মালিকানা সরকারের।
© ২০২২ - ২০২৫ সমবানী কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত