
শীতের আমেজ চারদিকে জানান দিতেই গাজীপুরের শ্রীপুরে শুরু হয়েছে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের কর্মব্যস্ততা। গ্রামবাংলার চিরায়ত এই দৃশ্য প্রতিবছরই শীতের আগমনী বার্তা হিসেবে মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। স্থানীয় গাছিদের পাশাপাশি নাটোর ও রাজশাহী জেলা থেকে আসা গাছিরাও সকাল-সন্ধ্যা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন গাছ পরিষ্কার, কাটা, রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজে।
গত বৃহস্পতিবার সকালে শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, খেজুর গাছের মাথায় উঠে দা, ছেনি (খোদাইয়ের অস্ত্র) ও পাতিল (মাটির কলস) নিয়ে রসের হাঁড়ি বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন কয়েকজন গাছি। গাছের বুক চিরে রস নামানোর যে সূক্ষ্ম কাজটি করতে হয়, তা দক্ষ হাতে করে যাচ্ছেন তারা।
স্থানীয়রা জানান, আশ্বিন-কার্তিকের শেষ দিক থেকেই এই প্রস্তুতি শুরু হয় এবং অগ্রহায়ণ, পৌষ-মাঘ পর্যন্ত চলে রস সংগ্রহের মৌসুম।
উপজেলার গাজীপুর, মাওনা,গোসিংগা, তেলেহাটি ও কাওরাইদ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামজুড়ে সকাল-বিকেল দেখা মিলছে গাছ প্রস্তুত ও রস সংগ্রহের ব্যস্ততা।
নয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা পল্লী চিকিৎসক বিজয় সরকার বলেন, শীতের আগমন মানেই টাটকা খেজুর রসের ঘ্রাণ। ভোরবেলা হাঁড়ি হাতে গাছিদের পাতিল নামাতে দেখা এ দৃশ্যটা যেন গ্রামের চিরচেনা আনন্দ। আগে আমরা নিজেরাই গাছ কাটতাম, কিন্তু বয়স হয়ে যাওয়ায় আর পারিনা। এখন রাজশাহী ও নাটোর থেকে আসা গাছিরাই সব গাছ কাটে।
নাটোর জেলার লালপুর উপজেলা থেকে আসা নবির উদ্দিন জানান, সময়মতো গাছ পরিষ্কার ও কাটা না হলে রস জমে না। রসের পরিমাণ ও মান অনেকটাই নির্ভর করে গাছের পরিচর্যা ও দক্ষতার ওপর।
তিনি আরও বলেন, এই কাজের ঝুঁকি অনেক। মাঝেমধ্যে অনেকে গাছ থেকে পড়ে আঘাতও পান। তারপরও বছরের এই সময়টায় আমরা জীবিকার তাগিদে দিনরাত খেটে যাই। একটি গাছ থেকে পুরো সিজনে গড়ে ৮-১০ কেজি রস পাওয়া যায়। সেই রস থেকে আমরা গুড়, পাটালি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি। সবই খাঁটি ও ভেজালমুক্ত।
স্থানীয় এলাকাবাসী মতে, খেজুরের রস ও গুড় শুধু শীতের খাবার নয়, এটি এ অঞ্চলের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্মৃতির অংশ। ভাপা পিঠার সঙ্গে টাটকা রস খাওয়ার জন্য ভোরে অনেকেই গাছিদের বাড়ি বা রসের হাঁড়ির পাশে ভিড় করেন। ভেজালমুক্ত গুড়ের চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে।
জৈনা বাজার থেকে গুর কিনতে আসা ওষুধ ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বলেন, আমি এখান থেকে কিছুদিন আগেও খেজুরের রস ও গুর নিয়ে ছিলাম গুণগত মান খুব ভালো পেয়েছি। তাই আজকে আবারও নিতে আসলাম।
নাটোর থেকে থেকে আসা গাছি আব্দুল কুদ্দুস জানান, আমরা গাজীপুরের শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় এসেছি এ কাজ করতে তার মধ্যে আমরা ৩ জন নয়াপাড়া এলাকায় উঠেছি এ এলাকায় ২২০টি খেজুরের গাছ রস থেকে পাটালি ও গুড় তৈরি করে বিক্রি শুরু করেছি। এ এলাকায় নতুন মৌসুমের গুড়ের চাহিদাও অনেক ভালো ।
আমরাদের রস ৩০০ টাকা কেজি এবং গুড় ৪০০ টাকা ধরে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের গুড়ের মান অনেক ভালো।আমরা প্রতি বছরই গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় আসি। আমরা চার মাস এলাকায় থাকবো সব খরচ বাদ দিয়ে আশা করছি আমাদের ৩ জনের ৫থেকে ৬ লক্ষ টাকা লাভ করে বাড়ি ফিরবো।
© ২০২২ - ২০২৫ সমবানী কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত