মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের ছয়চিরী দিঘীর পারে দুইশত বছরের ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা ও মেলা। দুইশত বছরের অধিক সময় ধরে অনুষ্ঠিত এ চড়ক পূজাকে কেন্দ্র করে ছয়চিরিসহ আশেপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। ২ দিনব্যাপী এ চড়ক পূজা ও মেলা শেষ হবে ১৫ এপ্রিল মঙ্গলবার।
প্রতি বছরের মত এবারও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে দর্শনার্থীর উপস্থিতি। চড়ক পূজা উপলক্ষে এক বিশাল মেলা বসে। ঐতিহাসিক ছয়চিরি দিঘী থেকে ভেসে উঠে ১০০ ফুট লম্বা চড়ক গাছ।
এ গাছের চুড়া থেকে মাচা পর্যন্ত চারটি পাখার মতো করে বাধা হয় চারটি মোটা বাঁশ এবং তাতে যুক্ত করা হয় মোটা লম্বা রশি।
জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী ছয়চিরি দিঘীর চার পাড়ের মধ্যে দিঘীর পূর্বপাড়ে ১টি, উত্তর পাড়ে ১টি এবং দক্ষিণ পাড়ে ২টি চড়ক গাছ স্থাপন করে পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
চড়ক পূজা শুরুর ১০/১২ দিন আগে থেকে বিভিন্ন এলাকার পূজারীদের মধ্যে ৪০/৫০ জন সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিব-গৌরীসহ নৃত্যগীত সহকারে ভিক্ষায় অংশ নেন। এ কদিন তারা পবিত্রতার সহিত সন্যাস ব্রত পালন করেন। এসময় তার নিরামিষ ভোজনসহ সারাদিন উপবাস পালন করেন।
চড়ক পূজার ২ দিন আগে পূজারীরা শ্মশানে গিয়ে পূজা অর্চনা করেন ও শেষে গৌরীর বিয়ে, গৌরী নাচ ও বিভিন্ন গান গেয়ে এবং ঢাকের বাজনায় সরগরম করেন গোটা এলাকা। বিশেষ করে জিহ্নবা ও গলায় গেঁথে দেয়া হয়। নৃত্যের তালে তালে চড়ক গাছ ঘুরানো হয়। জয়ধ্বনি এবং নারীরা উলুধ্বনি দিতে থাকেন। জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে ‘কালীনাচ’ এবং তান্ত্রিক মন্ত্র দিয়ে ৭টি বলিছেদ (লম্বা দা) এর উপর শিব শয্যা সবার কাছে খুব আকর্ষণীয়।
দর্শনার্থীরা জানান যুগ যুগ ধরে এ চড়ক উৎসব এ অঞ্চলের হিন্দুদের বেশ নাড়া দিয়ে আসছে। শেষ চৈত্রের গোধুলীলগ্নে চড়ক গাছ মাটিতে পূঁতে ঘোরানো হয়। এর আগে ভক্ত ও পূজারীরা চড়ক গাছে ফুল, দুধ ও চিনি দিয়ে পূজা দেয়। এসময় দর্শনার্থীরা জয়ধ্বনি এবং নারীদের কন্ঠে হুলু ধ্বনি দিতে থাকেন।
ছয়চিরী দিঘীর প্রতিষ্ঠাতা ধর্ম নারায়ণ রায় প্রসাদ চৌধুরীর চতুথর্দর বংশধর অঞ্জন প্রসাদ রায় চৌধুরী বলেন ঐতিহ্যবাহী ছয়চিরি দিঘীর পারে চড়ক পূজা ও মেলা সিলেট বিভাগের মধ্যে এতবড় আয়োজন আর আমার জানামতে নেই।
চড়কপূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক,মহন দাশ বলেন দেবতার পূজা-অর্চনা শেষে অপরাহ্নে মূল সন্ন্যাসী ৪ জন ভক্তের (জ্যান্ত মানুষের) পিঠে লোহার দু’টি করে বিরাট আকৃতির বড়শি গেঁথে রশিতে বেঁধে ঝুলিয়ে চড়ক গাছ ঘুরানো হয়। ঐতিহ্যবাহী এই চড়ক উৎসব দেখতে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামবে। হিন্দু ধর্মীয় পঞ্জিকা মতে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তি দিন এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
© ২০২২ - ২০২৫ সমবানী কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত