বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় মামলা জট এবং দীর্ঘসূত্রতা বছরের পর বছর ধরে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে কঠিন করে তুলেছে। এ বাস্তবতায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা Alternative Dispute Resolution (ADR) পদ্ধতি দেশে এক ধরনের নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে। কম সময়, কম খরচে এবং তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে আশার নতুন আলো ছড়িয়েছে এই পদ্ধতি।
নীলফামারী জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত আইনগত পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে ১ হাজার ৩ শত জনকে।
প্রি- কেস সংক্রান্ত তথ্যমতে, দেওয়ানি, ফৌজদারি ও পারিবারিক সংক্রান্ত প্রাপ্ত আবেদন ১২৮১টি, মিমাংসিত হয়েছে ৩৯৮টি, নথিজাত হয়েছে ৭৬০টি, মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ৩০২২জন।
আর পোস্ট- কেইস সংক্রান্ত তথ্যে বলা হয় দেওয়ানী, ফৌজদারী ও পারিবারিক আবেদনের সংখ্যা ৬৮২টি।
এর মধ্যে মীমাংসিত কেইস এর সংখ্যা ২৩৬টি, নথিজাত হয় ৩৬৪ টি। মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ১৮২৬ জন।
উল্লেখিত প্রি- কেইস ও পোস্ট-কেইস সংক্রান্ত মামলাগুলোতে এডিআর এর মাধ্যমে অর্থ আদায় পূর্বক উপকারভোগীদের হাতে ৫ কোটি ৫১ লক্ষ ৫১ হাজার ৯শত ৯৩ টাকা তুলে দেওয়া হয়।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কার্যক্রম মূলত দুটি ধাপে পরিচালিত হয়— প্রি-কেস ADR এবং পোস্ট-কেস ADR।
মামলা দায়েরের আগে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে প্রি-কেস ADR বলা হয়। এই পর্যায়ে দেনা-পাওনা সংক্রান্ত, ফৌজদারি ও পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
প্রি-কেস ADR-এর মাধ্যমে এই সময়ে বহু আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সাফল্য উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে, চলমান মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পোস্ট-কেস ADR কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দেনা-পাওনা, ফৌজদারি এবং পারিবারিক মামলায় পোস্ট-কেস ADR গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আদালতে দীর্ঘসূত্রিতার অবসান ঘটিয়ে মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত সমঝোতার ফলে মামলার সংখ্যা কমছে এবং মামলার সাথে জড়িত পক্ষগুলো দ্রুত ন্যায়বিচার পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ADR পদ্ধতির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি মূল কারণ।
প্রথমত, এটি সময় এবং খরচ উভয় দিক থেকেই তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ আদালতের প্রক্রিয়ায় না গিয়ে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বিশেষ করে পারিবারিক এবং দেনাপাওনার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় অবদান রাখছে। একই সঙ্গে দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিচারব্যবস্থায় বিরল একটি চিত্র।
যদিও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, তবুও এর পরিধি আরও বিস্তৃত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে হলে দেশের প্রতিটি স্তরে ADR বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
পাশাপাশি প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতাকারীর সংখ্যা বাড়ানো, লিগ্যাল এইড অফিসের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ এবং কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মামলায় বাধ্যতামূলক ADR কার্যক্রম পরিচালনার কথা বিবেচনা করতে হবে। এ ছাড়া, তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুবিধা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ) মোঃ মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, "আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, বিচারপ্রাপ্তির অধিকার সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার, এবং এই অধিকার বাস্তবায়নে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব। সবাইকে লিগ্যাল এইড সেবা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।"
© ২০২২ - ২০২৫ সমবানী কর্তৃক সর্বসত্ব ® সংরক্ষিত